Home : প্রচ্ছদ : ঝুলন্ত জঞ্জালে ছাড়ছে না ডিসিসিকে

ঝুলন্ত জঞ্জালে ছাড়ছে না ডিসিসিকে

হেলাল উদ্দিন হেলাল : দীর্ঘদিন পর তারের জঞ্জাল সরাতে উদ্যোগ নিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। শুরুও করেছিল সেই প্রক্রিয়া। গত ৫ আগস্ট থেকে সড়ক থেকে ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল সরাতে অভিযোগ শুরু করে দক্ষিণ সিটি। কিন্তু ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ও ক্যাবল অপারেটরদের প্রতিবাদের মুখে অভিযান স্থগিত করে নভেম্বর পর্যন্ত তার অপসারণে সময় বেধে দেয়া হয়। গত ১৮ অক্টোবর নগর ভবনে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) ও ক্যাবল অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের ( কোয়াব) নেতৃবৃন্দের সাথে এক বৈঠকে পর ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ১৯ অক্টোবর থেকে আইএসপিএবি ও কোয়াব তাদের নিজ উদ্যোগে এসব ঝুলন্ত তার ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থাপনায় নিয়ে যেতে কাজ শুরু করবে। ধানমন্ডি এলাকা হতে এই কার্যক্রম শুরু হবে এবং পুরো দক্ষিণ সিটিতে নভেম্বরের মধ্যে তারা এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। পুরো দক্ষিণ সিটিকে নভেম্বরের মধ্যে ঝুলন্ত তারের জঞ্জাল হতে মুক্তি দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে মেয়র তাপস বলেন, তারা নিজ খরচে, নিজ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির নিচ দিয়ে তারের সংযোগ নেবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে উপরে ঝুলন্ত তার কেটে দেবেন। আর এটা নভেম্বরের মধ্যেই তারা শেষ করবেন বলে কমিটমেন্ট দিয়েছেন।
আইএসপিএবি সভাপতি এম আমিনুল হাকিমও সেদিন বলেছিলেন, জানিয়েছিলেন নভেম্বরের মধ্যেই তার অপসারণ করতে পারবেন। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নির্দিষ্ট সময়ে ঝুলন্ত তার তো অপসারণ হয়নি বরং ৪০ দিনে দক্ষিণ সিটির একটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক কিছু কাজ হয়েছে। একই অবস্থা উত্তর সিটিতেও। গুলশান অ্যাভিনিউ ও উত্তরার তিনটি সড়কে তার অপসারণ করতে পেরেছে ডিএনসিসি। উভয় সিটিতেই আইএসপি ও কোয়াকবে তার অপসারণে আরও সময় বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মুখপাত্র মো. আবু নাছের বলেন, দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন সড়ক থেকে ঝুলন্ত তার অপসারণ করে মাটির নিচ দিয়ে নিতে নভেম্বর পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছিল। সেটি আরও এক মাস বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কাজ না হলে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডিএসসিসি এলাকায় ১৯ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত শুধু ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোড সংলগ্ন আশপাশের এলাকায় মাটির নিচে তার স্থাপনের কাজ শুরু করেছে আইএসপিএবি। অন্যদিকে ডিএনসিসিতে গুলশান এভিনিউ ও উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরের তিনটি সড়কে মাটির নিচ দিয়ে সংযোগ নেয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এর বাইরে উত্তরা ৪, ৬ ও ১১ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সড়কে এবং গুলশানের যুক্তরাষ্ট্র দুতাবাস এলাকা থেকে বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউতে কাজ চলছে।
আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, তারা বড় সড়কগুলোতে ঝুলন্ত তার অপসারণ করে মাটির নিচ দিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করেছেন। তবে এটি অনেক ব্যয়বহুল। সরকারের সহযোগিতা পেলে দুই বছরের মধ্যে রাজধানীর সকল সড়কে তার অপসারণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
রাজধানীর সড়কে সৌন্দর্য বাড়াতে এবং কম খরচে নিরবিচ্ছিন্ন দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দিতে ২০০৮ সালে ঝুলন্ত তার অপসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। এজন্য ফাইবার অ্যাট হোম, সামিট কমিউনিকেশন্সকে নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে এনটিটিএন লাইসেন্স প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে এই লাইসেন্স দেয়া হয় বাংলাদেশ রেলওয়ে, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ও বাহনকেও দেশব্যাপী তথ্য-প্রযুক্তির মহাসড়ক নির্মাণের জন্য এনটিটিএন লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোম ও সামিট কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে। এনটিটিএন লাইসেন্সের গাইডলাইন অনুযায়ী ভূ-গর্ভস্থ ফাইবার অপটিক্যাল নেটওয়ার্ক স্থাপন, সংস্কারসহ সার্বিক কাজ করবে এনটিটিএন অপারেটরা। কিন্তু নানাভাবেই বিভিন্ন আইএসপি অপারেটর, মোবাইলফোন অপারেটরসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রায় সময় অবৈধভাবে এই নেটওয়ার্ক স্থাপন করে আসছে। কোন কোন মোবাইল ফোন অপারেটর রেলওয়ে ও বিটিসিএলের সাথে চুক্তি করে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে নিজেরাই নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপন ও সংস্কার করছে। বিষয়টি নিয়ে এনটিটিএন অপারেটররা সোচ্চার হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
এদিকে নিয়ম অনুযায়ী আইএসপি আপারেটরগুলোকে লাস্ট মাইল সেবা প্রদান করার জন্য শর্ত দেয়া হলেও প্রায় সবগুলোই রাজধানীসহ সারাদেশ জুড়েই সড়কে বিদ্যুতের খুঁটি ব্যবহার করে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করছে। এর পেছনে তারা বরাবরই যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, এনটিটিএন অপারেটরদের সেবার মূল্য বেশি এবং প্রত্যেক ভবনে তাদের সংযোগ না থাকাকে।
অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই গত ১২ বছর ধরে বিটিআরসি ও বিদ্যুৎ বিভাগ রাজধানীর জঞ্জাল সরাতে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। সর্বশেষ রাজধানীর ঝুলন্ত ইন্টারনেট ও ডিসের তারসহ সকল তার অপসারণের জন্য ৩০ মে পর্যন্ত সময় বেধে দিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। ওই সময়ের মধ্যে তার অপসারণ না করলে তার কেটে দেয়াসহ সংশ্লিষ্ট আইএসপি ও ক্যাবল অপারেটরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিদ্যুৎ বিভাগ। সেই সময়সীমা অতিবাহিত হওয়ার পরও বিদ্যুৎ বিভাগ কোন উদ্যোগ না নিলেও গত ৫ আগস্ট থেকে মাঠে নামে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। কোন আল্টিমেটাম না দিয়ে তার অপসারণে শুরু করে ডিএসসিসি। একের পর এক সড়কে তার কাটতে থাকলে টনক নড়ে আইএসপিএবি ও কোয়াবের। তবে সংগঠন দুটি বিগত দিনের মতো আবারও হুমকী-ধামকীর পথ বেছে নেয়। ১৮ অক্টোবর থেকে ইন্টারনেট ও ক্যাবল টেলিভিশন সংযোগ বন্ধের হুমকী দেন। বিষয়টি নিয়ে আইএসপিএবি ও কোয়াবের সাথে ভার্চুয়াল সভায় মিলিত হন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। উভয় মন্ত্রীই সংগঠন দুটিকে ধর্মঘট কর্মসূচি থেকে সরে আসার আহ্বান জানান এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানের আশ্বাস দেন। এরপর নগর ভবনে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস।
ঝুলন্ত তার অপসারণ না হওয়ার কারণ সম্পর্কে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, বড় সড়কে দুই এনটিটিএন অপারেটরের অপটিক্যাল ফাইবার বসানো থাকলে প্রতিটি ভবনে তাদের সংযোগ নেই। এছাড়া তাদের সেবার মূল্য অনেক বেশি।
ফাইবার অ্যাট হোমের গভর্নমেন্ট রিলেশন্স এন্ড রেগুলেটরি বিভাগের প্রধান আব্বাস ফারুক বলেন, ফাইবার এট হোমের সারাদেশে সকল জেলা ও উপজেলায় ৫০ হাজার কিলোমিটার ফাইবার রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১৮শ’ কিলিমিটার ম্যাশ নেটওয়ার্ক। আর ৬টি এলাকায় সব বিল্ডিংয়ে নেটওয়ার্ক রয়েছে। এছাড়া গ্রাহকরা যখন যেখানে নেটওয়ার্ক চাইবে আমরা সেখানে দিতে প্রস্তুত। মূল্যের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বরাবরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানিয়েছি আমাদের সেবার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য। সরকার যদি বিদ্যমান মূল্য নির্ধারণ করে দেয় সেটিতেও সেবা দিতে আমরা বাধ্য এর চেয়ে কম ও বেশি হলেও সেবা দিতে হবে। তবে যেটাই করুক তা হতে হবে যৌক্তিক।
এদিকে তার অপসারণ নিয়ে গত ১১ নভেম্বর বিটিআরসিতে সব পক্ষকে নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয়: যেসব এলাকায় গ্রাহক প্রাপ্ত পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে সংযোগ রয়েছে সেখানে ঝুলন্ত তার অপসারণ করতে হবে। যেসব এলাকায় গ্রাহক প্রান্ত পর্যন্ত সংযোগ নেই সেখানে লাইন বসাতে লিখিতভাবে এনটিটিএন অপারেটরকে জানাতে হবে, তারা ৭ দিনের মধ্যে আইএসপি অপারেটরকে জানাবে। এনটিটিএন অপারেটর না দিতে পারলে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তিন মাসের মধ্যে মাটির নিচ দিয়ে অপটিক্যাল ফাইবার বসাবে। সমঝোতার মাধ্যমে এনটিটিএন অপারেটর ও আইএসপিএবি শুধু ঢাকা শহরের জন্য মাটির নিচের ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল ব্যবহারের জন্য অন্তর্বতীকালীন ফি নির্ধারণ করবে। সরকার মূল্য নির্ধারণ করার আগ পর্যন্ত এই মূল্যে এনটিটিএন সেবা প্রদান করবে এবং আইএসপি সেবা গ্রহণ করবে।

About Moniruzzaman Monir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*