Home : বাংলাদেশ : জেলার খবর : নাটোরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিপাকে কয়েক লাখ মানুষ পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে শহর-গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

নাটোরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, বিপাকে কয়েক লাখ মানুষ পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে শহর-গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

নিজস্ব প্রিতেবদক
নাটোর: নাটোরে বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একদিনের ব্যবধানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
পানি বাড়ায় গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে বেশ কয়েকটি পাকা সড়ক।

জেলার সিংড়া গুরুদাসপুর ও নলডাঙা উপজেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পানিবন্দি জীবনযাপন করছেন বন্যাকবলিত এলাকার কয়েক লাখ মানুষ। এসব দুর্গত এলাকার অনেকেই ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। এ নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন জেলা, উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

এদিকে, বন্যার পানি অব্যাহতভাবে বাড়ায় নদ-নদীসহ চলনবিল ও হালতিবিলে বিপৎসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানিতে ডুবে গেছে সবজি, রোপা আমনের ক্ষেত এবং ভেসে গেছে কয়েক হাজার পুকুরের মাছ। পুকুর মালিকরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও মাছ রক্ষা করতে পারছেন না। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মাছচাষি ও কৃষকরা।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে আত্রাই নদীর সিংড়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১১১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) একই সময় পানি প্রবাহিত হয়েছিল ১০৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তা ৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে।

নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু রায়হান এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘যেসব সড়ক ভেঙে গেছে, তা মেরামতের চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে বালুর বস্তা দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। বন্যা কবলিত এলাকার পানিবন্দি মানুষদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ’

সিংড়া উপজেলার তাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন জানান, বন্যার পানির প্রবল স্রোতে বৃহস্পতিবার সকালে তাজপুর-হিয়াতপুর বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এছাড়া, সিংড়ার সঙ্গে তাজপুরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুল জব্বার জানান, সারারাত পরিশ্রম করে দু’টি বাঁধ রক্ষা করে ভোরে বাসায় যাওয়ার পর খবর পান, তাজপুর-হিয়াতপুর বাঁধ ভেঙে গেছে।

সিংড়ার স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যার পানির তোড়ে বৃহস্পতিবার সকালে সিংড়া পৌরসভার ভেতরে কলম-সিংড়া সড়কের শোলাকুরা এলাকায় পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। এতে বেশ কয়েকটি গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ’

তিনি বলেন, ‘আত্রাই নদীর পানি বাড়ছেই। ফলে নদীর ধারে অবস্থিত সিংড়া পৌর এলাকা বন্যায় ব্যাপকভাবে প্লাবিত হচ্ছে। তাই শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। ’

স্থানীয়দের অভিযোগ, আত্রাই নদীতে বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে পেতে রাখা সুতি জালের কারণে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পানি উপচে পড়ে নদীর দু’ধারে চাপ সৃষ্টি করছে। এতে একদিকে চলন বিলের বাঁধগুলো ভেঙে যাচ্ছে, অপরদিকে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। প্রশাসন বারবার অভিযান চালিয়ে এসব সুঁতি জাল অপসারণ করলেও, তারা আবারও সুতি জাল দিয়ে মাছ শিকার করছেন। এসব কারণে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, অল্প সংখ্যক মানুষের জন্য এলাকার কয়েক লাখ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসব সুতি জাল অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তা না করা হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এছাড়া, বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোসহ তাদের মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।

অপরদিকে, জেলার নলডাঙা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্লাবিত হয়েছে অন্তত ২৫-৩০টি গ্রাম। পানিবন্দি মানুষরা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছেন। এসব এলাকার রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে বেশ কয়েকটি সড়ক। যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, আমজাদ হোসেন দেওয়ান, কলিমুদ্দিন, হাফিজুর রহমান বাবু এ তথ্য জানান।

নলডাঙা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তার উপজেলায় হালতি বিলের গ্রামগুলোতে পানি প্রবেশ করেছে। মাধনগর ও খাজুরা ইউনিয়নের সব সড়ক পানিতে ডুবে গেছে। পিপরুল ও ব্রহ্মপুর ইউনিয়নের কিছু এলাকার গ্রাম ও সড়ক বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

এসব এলাকার মানুষদের মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। পানিবন্দি মানুষদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করতে সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

About Moniruzzaman Monir

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*